প্রত্যয়নপত্র-আইডি কার্ডের শর্তে ভোগান্তি, টাঙ্গাইল পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে প্রশ্ন
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি | বাংলা নিউজ সেন্টার (BNC)
টাঙ্গাইল আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ই-পাসপোর্ট করতে আসা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে গেলেও বিভিন্ন ছোটখাটো ত্রুটি বা অতিরিক্ত কাগজপত্রের কারণে আবেদনকারীদের ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
সম্প্রতি পাসপোর্টের বায়োমেট্রিক দিতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন এক আবেদনকারী। শিক্ষাগত সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে অফিসে যাওয়ার পরও তাকে শিক্ষার্থীর প্রত্যয়নপত্র আনার কথা বলা হয়। ফলে সেদিন তার বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হয়নি এবং পরবর্তী সময়ে আবার অফিসে আসতে বলা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর প্রশ্ন, শিক্ষাগত যোগ্যতার সরকারি সনদ থাকার পরও যদি একজন আবেদনকারীর জন্য শিক্ষার্থীর প্রত্যয়নপত্র বা আইডি কার্ড অপরিহার্য হয়, তাহলে সেই প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আবেদন প্রক্রিয়ার শুরুতেই স্পষ্টভাবে জানানো হয় না কেন?
একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উপজেলা থেকে পাসপোর্ট করতে আসা আবেদনকারীদের কাছ থেকেও।
কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে ইমরান বলেন, তিনি পাসপোর্টের আবেদন ফরম জমা দিতে গিয়ে ফেরত এসেছেন। সেখানে তার কাছে শিক্ষার্থীর প্রত্যয়নপত্র চাওয়া হয়। তিনি জানান, বর্তমানে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে শিক্ষার্থীর আইডি কার্ড কোথা থেকে দেবেন, সেটি নিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েছেন। তার কাছে শিক্ষাগত সনদ থাকার কথা জানালেও সেটি দেখার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর আইডি কার্ড চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইমরান বলেন, এতে তিনি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এদিকে পাসপোর্ট অফিসের বাইরে দালালদের তৎপরতা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের ‘দালাল’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করেছেন, নতুন পাসপোর্টের আবেদন ফাইল অফিসে জমা দেওয়ার সময় কোনো ছোটখাটো ত্রুটি থাকলে অথবা কোনো কাগজপত্র না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে ফাইল গ্রহণ করা হয় না। এরপর আবেদনকারী বাইরে বের হলে তারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং টাকা নিয়ে একই দিন বায়োমেট্রিক করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ।
দালালদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের কাজের জন্য আবেদনকারীদের কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত চুক্তি করা হয়। তাদের দাবি, আবেদনকারীরা কয়েক দিন অফিসে ঘুরেও কাজ সম্পন্ন করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত তাদের কাছেই ফিরে আসেন।
তবে এসব বক্তব্য দালালদের নিজেদের দাবি; এর সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সখীপুর থেকে পাসপোর্ট করতে আসা এক নারী জানান, তার সঙ্গে ১০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছিল। তার দাবি, তিনি শুধু একদিন পাসপোর্ট অফিসে এসে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়েছিলেন এবং প্রায় এক মাস পর পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে এসেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শুধু নিজের মোবাইল নম্বরে এবং ওই মোবাইল নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপে ভোটার আইডি কার্ড, ছবি এবং বাবা-মায়ের ভোটার আইডি কার্ড পাঠিয়েছিলেন; বাকি কাজ অন্য পক্ষ করে দিয়েছে।
এ বিষয়ে Bnc News-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাসপোর্ট সেবা নিতে আসা সাধারণ আবেদনকারীদের একটি অংশ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদন প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন শর্ত সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় অফিসে এসে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র আবেদনকারীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে সাধারণ আবেদনকারীদের প্রশ্ন, যাদের কাগজপত্রে ছোটখাটো সমস্যা রয়েছে তাদের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি একই অফিসের বাইরে দালালরা কীভাবে টাকা নিয়ে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার দাবি করতে পারে?
আরও প্রশ্ন উঠেছে, সাধারণ আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে কাগজপত্রের ত্রুটি কঠোরভাবে যাচাই করা হলে দালালদের মাধ্যমে কাজ করিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে একই নিয়ম কীভাবে কার্যকর হচ্ছে। যদি কেউ ঘুষ বা অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে সরকারি সেবা নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—এমন প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
সাধারণ গ্রাহক সমিতির সহসভাপতি খন্দকার নাজিম উদ্দিন বলেন, পাসপোর্ট অফিসে দালাল রোধে মাঝে মধ্যেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিছুদিন পরপর প্রশাসনের লোকজন এসে পাসপোর্ট অফিসের সামনে দালালদের আটক করে নিয়ে যায়। তবে কিছুদিন পর আবার আগের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কয়েকজন দালাল নিয়মিতভাবে আবেদনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র সংগ্রহ করেন। এমনকি আবেদনকারীর অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের আইডি ও প্রয়োজনীয় তথ্য হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সংগ্রহ করে পরবর্তীতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করার অভিযোগও উঠেছে।
পাসপোর্ট সেবায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা স্পষ্টভাবে জানানো, আবেদনকারীদের হয়রানি বন্ধ করা এবং দালালদের তৎপরতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
একই সঙ্গে তাদের দাবি, সরকারি নিয়মে যে কাগজপত্র প্রয়োজন তা আবেদনকারীদের শুরুতেই পরিষ্কারভাবে জানানো হোক। যাতে সাধারণ মানুষ বারবার অফিসে এসে হয়রানির শিকার না হন এবং কোনো দালালের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য না হন।
সবশেষ খবর সবার আগে পেতে Bnc news-এর সাথেই থাকুন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের bncbd.com ভিজিট করুন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন