খুলনা কয়রায় সুন্দরবনে শুরু হচ্ছে মধু আহরণ মৌসুম, লক্ষ্যমাত্রা ১১০০ কুইন্টাল


কয়রা প্রতিনিধি | বাংলা নিউজ সেন্টার (BNC)

খুলনা জেলার কয়রা উপজেলাসংলগ্ন সুন্দরবনে আগামী ১ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত মধু আহরণ মৌসুম। বন বিভাগের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ১১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মৌমাছির মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে মৌয়ালদের নৌকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং বৈধ পাশ (পারমিট) নিয়েই তারা বনে প্রবেশ করবেন।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ মৌসুমে সুন্দরবনের সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ এলাকায় ২৪৮টি বৈধ পাশের বিপরীতে ১৭০৯ জন মৌয়াল বনে প্রবেশ করেন। ওই সময়ে প্রাকৃতিক চাক থেকে ৮৫৪.৫ কুইন্টাল মধু এবং ২৭৫.৫ কুইন্টাল মৌমাছির মোম সংগ্রহ করা হয়। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চলতি ২০২৫-২০২৬ মৌসুমে বাড়তি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, প্রতিবছরের মতো এবারও সুন্দরবনের বিভিন্ন রেঞ্জে পর্যায়ক্রমে মৌয়ালদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। নির্ধারিত পাস নিয়ে দলবদ্ধভাবে তারা গভীর বনে প্রবেশ করে প্রাকৃতিক চাক থেকে মধু সংগ্রহ করবেন। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলে।

কয়রা উপজেলার উপকূলীয় এলাকার একাধিক মৌয়াল বাংলা নিউজ সেন্টারকে জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও তারা দলবদ্ধভাবে মধু আহরণে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা বলেন, সুন্দরবনের মধু প্রাকৃতিক ও ভেজালমুক্ত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

তবে তারা জানান, মধু আহরণে প্রতি বছরই জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়। বনের ভেতরে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বিষধর সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী এবং প্রতিকূল পরিবেশ তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি সম্প্রতি বনদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগও বেড়েছে। মুক্তিপণের দাবিতে জেলেদের অপহরণের ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে।

বিএনিসি (BNC)-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বনদস্যুদের চাঁদাবাজির কারণে অনেক মৌয়াল এবার বনে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৌয়াল জানান, প্রতি জনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দাবি করছে ডাকাত দল, যা অনেকের পক্ষেই পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

স্থানীয় এক মৌয়াল বাংলা নিউজ সেন্টারকে জানান, গত মৌসুমে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি বাঘের মুখোমুখি হন। তিনি বলেন, “হঠাৎ সামনে বাঘ দেখে আমরা চিৎকার করি এবং গাছের উপর আঘাত করতে থাকি। পরে বাঘটি সরে গেলে আমরা দ্রুত নৌকায় ফিরে আসি।” তিনি আরও বলেন, “মধু খোঁজা আর বাঘ খোঁজা প্রায় একই কথা, প্রতিনিয়ত জীবন ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়।”

বন বিভাগ জানিয়েছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বনজ সম্পদ সংরক্ষণে নির্ধারিত নিয়ম মেনে মধু সংগ্রহ করতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে চাক ধ্বংস বা অতিরিক্ত আহরণ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, অনুকূল আবহাওয়া ও বনজ পরিবেশ ভালো থাকলে চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এতে সরকার রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কয়রাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো মৌয়াল পরিবারের জীবিকায় স্বস্তি ফিরবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post
×